Bangla Romantic Golpo | টুইঙ্কেল বেল | পর্ব ০৫
Bangla Romantic Golpo | টুইঙ্কেল বেল | পর্ব ০৫ |…
Bangla Romantic Golpo | টুইঙ্কেল বেল | পর্ব ০৫ | লেখা: লামিয়া রহমান মেঘলা
রূপকথা নিজের পা জোড়া যেন জমাট বেঁধে যেতে অনুভব করল।
তার সামনে রাস্তায় রুশোর নিথর দেহখানা পড়ে আছে।
রক্তের স্রোত বয়ে চলেছে, চারিদিক লাল রক্তে রঞ্জিত।
রূপকথা যেন কথা বলার ক্ষমতাটুকুও হারিয়ে ফেলেছে।
রুশোর মুখটা অস্বাভাবিক ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে, যেন মুহূর্তের মধ্যেই জীবনের সমস্ত রঙ তার মুখ থেকে মুছে গেছে।
হঠাৎ করেই রূপকথা অনুভব করল, তার চোখের সামনে সবকিছু ধীরে ধীরে ঘোলা হয়ে আসছে।
দৃষ্টির প্রান্তে কালো কালো বিন্দু ভেসে উঠতে লাগল।
প্রতিটি শ্বাস যেন ভারী হয়ে উঠছে, শরীরের সমস্ত শক্তি মুহূর্তে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে।
চোখের সামনে অন্ধকার আরও ঘনিয়ে আসতেই সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
ধপাস করে রাস্তায় লুটিয়ে পড়ল সে।
————
রূপকথার জ্ঞান ফিরতেই সে নিজেকে হাসপাতালের চার দেয়ালে ঘেরা একটি কেবিনে আবিষ্কার করল।
তার হাতে সেলাইন চলছে।
চোখ দুটো আলোর সঙ্গে মানিয়ে নিতে না নিতেই হঠাৎ রুশোর কথা মনে পড়ে গেল তার।
মুহূর্তেই রূপকথা লাফিয়ে উঠে বসল।
হাতের সেলাইন বন্ধ করে কেনোলার সামনের সূচটা টেনে খুলে ফেলল সে।
এরপর দ্রুত পায়ে বেড থেকে নেমে কেবিন থেকে বেরিয়ে এলো।
কেবিন থেকে বেরিয়েই দৌড়ে ছুটল তৃতীয় তলার অপারেশন থিয়েটারের দিকে।
রূপকথা এই হাসপাতালেই এসে প্র্যাকটিক্যাল করত, তাই হাসপাতালের প্রতিটি করিডোর, প্রতিটি তলা সম্পর্কে তার স্পষ্ট ধারণা ছিল।
অপারেশন থিয়েটারের সামনে এসে সে দেখতে পেল রাজিয়া শেখ চেয়ারে বসে আছেন।
তার পাশেই প্রোমা।
রূপকথা এগিয়ে যেতেই রাজিয়া শেখ উঠে দাঁড়ালেন।
চিন্তিত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,
“বউমা উঠে এলি কেন? শরীর ঠিক আছে এখন?”
“আম্মু, আমার কথা বাদ দিন। রুশো কেমন আছে সেটা বলুন। আম্মু, আমার রুশো কেমন আছে? ওনার কিছু হয়নিত?”
রূপকথাকে এমন পাগলের মতো আচরণ করতে দেখে রাজিয়া শেখ তাকে জড়িয়ে ধরলেন।
“শান্ত হ মা। শান্ত হ। তুই এভাবে ভেঙে পড়লে আমার রুশোকে কে সামলাবে?”
রূপকথা শাশুড়িকে আঁকড়ে ধরেই মেঝেতে বসে পড়ল।
“আম্মু, রুশোর কিছু হয়ে গেলে আমি বাঁচব না আম্মু।”
রূপকথার কথাটা শেষ হতে না হতেই অপারেশন থিয়েটার থেকে ডাক্তার বেরিয়ে এলেন।
ডাক্তারকে দেখেই রূপকথা এগিয়ে গেল।
“স স্যার, র রুশো কেমন আছে?”
ডক্টর নাহিদ।
রূপকথার স্যার।
ডক্টর নাহিদ রূপকথাকে শান্ত হতে বলে বললেন,
“শান্ত হও রূপকথা। রুশো এখন আউট অব ডেঞ্জার। এভাবে ভেঙে পড়ো না। ও এখন অজ্ঞান থাকবে হয়তো ১ থেকে ২ দিন। কিন্তু আল্লাহর রহমতে আমরা ওকে বাঁচাতে পেরেছি।”
রূপকথা নিজেকে সামলে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
“স্যার, আমি কি একটু ওকে দেখতে পারি?”
“এখন নয়। ওকে কেবিনে শিফট করি, এরপর।”
ডক্টর নাহিদ কথাটা বলে সেখান থেকে চলে গেলেন।
ডাক্তার চলে যেতেই রূপকথা চেয়ারে বসে পড়ল।
“আম্মু, আমি পারলাম না রুশোকে সামলে রাখতে। আমাকে ক্ষমা করে দিন আম্মু।”
রাজিয়া শেখ রূপকথার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
“নারে মা। তোর দোষ নেই। আমার ছেলের শত্রুর অভাব নেই। তোর সঙ্গে গার্ডস না পাঠালে হয়তো তোদের দুজনকেই আমি আমার বুকে ফেরত পেতাম না। কখনো নিজেকে আমার ছেলে বউ ভাববি না। তুই আমার মেয়ে।”
রূপকথা শাশুড়ির বুকে মাথা ঠেকাল।
রাজিয়া শেখ তার মাথায় স্নেহের হাত রাখলেন।
“শান্ত হ মা।”
———-
আরবাজ আজগর নিজের সমস্ত নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়ে দিয়েছেন।
কে এমনটা করেছে, আর কীভাবে করেছে, সেই সত্য খুঁজে বের করতেই তিনি সর্বশক্তি নিয়োগ করেছেন।
ফোনে কথা বলার জন্য তিনি হাসপাতাল থেকে বাইরে এসেছিলেন।
কথা বলা শেষ করে পকেট থেকে একটি সিগারেট বের করলেন।
কিছুক্ষণ নীরবে ধোঁয়া টানতে লাগলেন তিনি।
ঠিক সেই সময় রায়হান ছুটে এলো তার কাছে।
“স্যার। স্যার।”
রায়হান হাপিয়ে উঠেছে।
আরবাজ আজগর ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকালেন।
“কি হয়েছে?”
“স্যার, আপনাকে এক্ষুনি রওনা করতে হবে। ইতালিতে যেতে হবে। ওখানের ফ্যাক্টরিতে আমাদের অনেক বড় সমস্যা হয়েছে। এক্ষুনি কেউ না গেলে কয়েক মিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হবে।”
আরবাজ আজগরের মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল।
“তুমি কি পাগল হয়েছ? আমি কিভাবে যাব সেখানে? রুশোর কি হবে?”
“স্যার, ট্রায় টু আন্ডারস্ট্যান্ড। বসের কাছে আমি আছি, ম্যাম আছে। বাট ওখানে কেউ না গেলে বিষয়টা সামাল দিতে পারব না।”
আরবাজ আজগর গভীর চিন্তায় পড়ে গেলেন।
এই মুহূর্তে ঠিক কী করা উচিত, তা যেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না তিনি।
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর তিনি ভেতরে চলে গেলেন।
রাজিয়া শেখের সঙ্গে কথা বলার জন্য।
সব শুনে রাজিয়া শেখ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“তুমি যাও আরবাজ। আমি সামলে নিব।”
“পারবে তো?”
“পারব।”
রাজিয়া শেখের কণ্ঠে ছিল দৃঢ়তা, আর চোখে অটল ভরসা।
আরবাজ আজগর আর সময় নষ্ট করলেন না।
সেই মুহূর্তেই এমারজেন্সি ফ্লাইটে ইতালির উদ্দেশ্যে রওনা করলেন তিনি।
———-
সকালের সূর্য ধীরে ধীরে ঢলে পড়েছে পশ্চিম আকাশে।
সারাদিনের তীব্র দাবদাহ শেষে সন্ধ্যা নামার আগমুহূর্তে চারিদিক ঘন কালো মেঘে ছেয়ে গেছে।
আকাশের মুখ ভার, যেন সেও কোনো গভীর শোকে স্তব্ধ হয়ে আছে।
রূপকথা বসে আছে রুশোর পাশে।
নিঃশব্দ কেবিনে তার সমস্ত মনোযোগ আটকে আছে রুশোর ঘুমন্ত মুখখানায়।
সে তাকিয়ে আছে, আর তার চোখ বেয়ে একের পর এক অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়ছে।
বারবার হাত তুলে সেই গড়িয়ে পড়া পানি মুছে দিচ্ছে রূপকথা।
কিন্তু অবাধ্য চোখের জল যেন কোনো বাধাই মানছে না।
সব বাঁধন ছিঁড়ে একের পর এক নেমে আসছে নিচে।
সকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়েছে, অথচ রূপকথা এক দানা পানিও মুখে দেয়নি।
রাজিয়া শেখ বহুবার চেষ্টা করেও তাকে কিছু খাওয়াতে পারেননি।
হাসপাতালে একজনের বেশি থাকার অনুমতি নেই।
তাই অনেক বুঝিয়ে রাজিয়া শেখ এবং প্রোমাকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে রূপকথা।
রুশোকে এভাবে দেখে তার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে।
বুকের ভেতরটা যেন হাহাকার করে উঠছে বারবার।
মনে হচ্ছে কেউ যেন তার হৃদপিণ্ডটা মুঠো করে চেপে ধরেছে।
লোকটার বাচ্চামিতে ভরা কথাগুলো, তার নির্বোধ অথচ মায়াভরা কর্মকাণ্ডগুলো, সবকিছু আজ অসহ্যভাবে মনে পড়ছে।
রূপকথা ভীষণভাবে মিস করছে সেসব।
এই মানুষটাকে কখন যে সে এত গভীরভাবে ভালোবেসে ফেলেছে, তা রূপকথা নিজেও জানে না।
হয়তো ভালোবাসা এমনই।
নিঃশব্দে এসে হৃদয়ের গভীরতম স্থানে শেকড় গেঁড়ে বসে, আর মানুষ টেরই পায় না কখন সে সম্পূর্ণভাবে কারও হয়ে গেছে।
বাইরে হঠাৎ করেই আকাশ ফেটে বৃষ্টি নামল।
প্রথমে টুপটাপ, তারপর ধীরে ধীরে ঝমঝম শব্দে।
জানালার কাঁচে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো আছড়ে পড়ছে একের পর এক।
বিদ্যুতের ঝলকানি মাঝে মাঝে কালো আকাশ চিরে দিচ্ছে, তারপরই গর্জে উঠছে মেঘ।
বৃষ্টির পানি জানালার কাঁচ বেয়ে নিচে নেমে আসছে, যেন আকাশও আজ রূপকথার সঙ্গে কাঁদছে।
প্রকৃতি যেন তার বুকের সমস্ত জমে থাকা বেদনা উজাড় করে দিচ্ছে।
কেবিনের ভেতরে শুধু মেশিনের ক্ষীণ শব্দ আর রুশোর ধীর শ্বাসপ্রশ্বাস।
তার মাঝখানে বসে থাকা রূপকথার পৃথিবী যেন থমকে গেছে।
সে আলতো করে রুশোর হাত নিজের দুই হাতের মুঠোয় নিল।
হাতটা ঠান্ডা। নিস্তেজ।
এই প্রথম সে বুঝল, মানুষটা তার কাছে ঠিক কতটা।
রূপকথার গলা বুজে এলো।
সে ফিসফিস করে বলল,
“আপনি তাড়াতাড়ি উঠে পড়ুন। প্লিজ। আপনার ওই বাচ্চামি কথা শুনে আমি বিরক্ত হব, তবুও শুনব। আপনি শুধু চোখ খুলুন।”
কথা শেষ করতেই তার গলা কেঁপে উঠল।
অঝোরে কান্না ভেঙে পড়ল সে।
ঝড়বৃষ্টি, কান্না আর দীর্ঘ অপেক্ষার মধ্য দিয়েই রাতটা কেটে গেল।
মাঝরাতের দিকে ক্লান্তিতে শরীর আর সায় দিল না।
অবশেষে রূপকথা রুশোর পাশেই মাথা রেখে চোখ বন্ধ করল।
কাঁদতে কাঁদতেই একসময় ঘুমিয়ে পড়ল সে।
ঘুমের মাঝেও তার হাত শক্ত করে ধরা রইল রুশোর হাত।
যেন ঘুমের মধ্যেও সে মানুষটাকে হারাতে রাজি নয়।
রূপকথা যখন বিল দিচ্ছিল, ঠিক তখনই অনি এসে জানায় যে রূপকথা বিপদে আছে। সেই মুহূর্তে রুশোর মস্তিষ্কে একটাই কথা ঘুরপাক খেতে থাকে “রূপকথা বিপদে”
সে আর এক মুহূর্ত দেরি না করে বাইরে বেরিয়ে আসে। রাস্তার ওপারে সে দেখে রূপকথার মতোই দেখতে এক মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটির পরনে রূপকথার মতোই শাড়ি। সে কাউকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, যেন কোনো অজানা ভয়ের হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে চাইছে।
রুশোর বিভ্রান্ত মন তাকে বিশ্বাস করায় যে ওটাই রূপকথা। সেই ভুল বিশ্বাসে সে চারপাশের গাড়ির দিকে খেয়াল না করে রাস্তার মাঝখানে চলে যায়।
ঠিক সেই মুহূর্তে একটি দ্রুতগামী ট্রাক এসে তাকে ধাক্কা দেয়। ভয়াবহ এক দুর্ঘটনায় রুশো গুরুতরভাবে আহত হয় এবং অচেতন হয়ে পড়ে।
ঘটনাটি দূর থেকে রূপকথার চোখে পড়ে। সে রুশোকে এভাবে দেখে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে এবং সেখানেই জ্ঞান হারায়।
রূপকথা ও রুশোর সঙ্গে থাকা গার্ডরা দ্রুত পরিস্থিতি সামলে নেয়। তারা সঙ্গে সঙ্গে রাজিয়া শেখ এবং আরবাজ আজগরকে ফোন করে পুরো ঘটনা জানায় এবং দুজনকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে আসে।
হসপিটালে একাধারে দুই দিন কেটে যায় রুশোর জ্ঞান ফেরার অপেক্ষায়।
রূপকথার চোখ দুটো ক্লান্ত হয়ে আসে।
তার শরীরও যেন ভারী ক্লান্তিতে নুয়ে পড়ে।
রাজিয়া শেখ সকালে খাবার নিয়ে এসেছিলেন।
রূপকথার মুখের দিকে তাকিয়ে তার ভীষণ মায়া হয়।
“মা, আজকে বাড়ি চলে যা তুই”
রূপকথা মলিন হেসে উত্তর দেয়
“না আম্মু। ওনার জ্ঞান ফিরুক আমার কোনো সমস্যা নেই। আমি ঠিক আছি”
রাজিয়া শেখ আর কিছু বলতে যাচ্ছিলেন এমন সময় হঠাৎ রুশো সাড়া দেয়।
দুজনই তা দেখে রুশোর পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।
ধীরে ধীরে রুশো চোখ খুলে তাকায়।
চোখ খুলে প্রথমে কিছুই বুঝতে পারে না, পরক্ষণে ধীরে ধীরে চারপাশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে তার কাছে।
রুশোর জ্ঞান ফিরতে দেখে রাজিয়া শেখ দ্রুত ডাক্তারের ডাকতে চলে যান।
রূপকথা রুশোর পাশে বসে তার হাত ধরে সেখানে চুমু খেয়ে জিজ্ঞেস করে
“রুশো কেমন লাগছে আপনার আপনি ঠিক আছেন আপনি জানেন আপনি আমাকে কত ভয় পাইয়ে দিয়েছিলেন”
রূপকথা এগিয়ে গিয়ে রুশোর কপালে চুমু খেতে যায় এমন সময় রুশো তাকে একসাথে ধরে বসায়।
রূপকথা অবাক হয়ে যায়।
রুশো রূপকথাকে নিজের থেকে সরিয়ে দেয়।
“এক্সকিউজ মি হু আর ইউ”

