Bangla Romantic Golpo | সুইটহার্ট | পার্ট-৫
মেহরিন, শিফা আর শাওনকে ঝড়ের বেগে বাড়িতে প্রবেশ করতে দেখে…
মেহরিন, শিফা আর শাওনকে ঝড়ের বেগে বাড়িতে প্রবেশ করতে দেখে কপাল কুঁচকে নিলেন সুফিয়া বেগম। বসার ঘরে বসে টিভি দেখছিলেন তিনি। পাশেই স্বামী মনোয়ার শেখ বসে আছেন। হাতে তার খবরের কাগজ। আজ বাড়িতেই ছিলেন মেয়েকে পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে বলে। একমাত্র মেয়ে তার। ছোট্ট থেকে বহু আদর-যত্নে মানুষ করেছেন। মেয়ের যে বিয়ের বয়স পাড় হয়ে যাচ্ছে এমনটা নয়, তবে তিনি বেঁচে থাকতে থাকতে মেয়ের সংসার দেখে যেতে যান। তাই এতো তারাহুরো তার।
অন্যদিকে, দরজা খুলেই তিনজন এমনভাবে ভেতরে ঢুকলো যেন তাদের পেছনে পুলিশ লেগেছে। মনোয়ার শেখ খবরের কাগজ নামিয়ে বললেন—-
—কি হয়েছে?
—কিছু না!
একসাথে বলে উঠলো তিনজন। কপাল কুঁচকে নিলেন মনোয়ার শেখ। তিনি জানেন মেয়ে তার কেমন। কিছু না হলে যে এভাবে দৌড়াবে না তার তার জানা আছে। তাই কপালে ভাজ ফেলে ফের জিজ্ঞেস করলেন—-
—কিছু না হলে এমন হাঁপাচ্ছিস কেন?
—দৌড় প্রতিযোগিতা করছিলাম।
চট করে উত্তর দিলো মেহরিন। মনোয়ার শেখের কুঁচকানো কপাল আরো কুঁচকে গেলো।
—রাস্তায়?
—জি।
—তিনজন মিলে?
—জি।
—তোরা তিনজনই পাগল।
গম্ভীর মুখে মন্তব্য করলেন মনোয়ার শেখ।
অন্যদিকে সুফিয়া বেগমের সন্দেহ হলো। তিনি চোখ সরু করে তাকালেন তিনজনের দিকে। কিন্তু তার আগেই শাওন বলে উঠলো—-
—খালামনি, পরে কথা বলি। জরুরি মিটিং আছে।
কথাটা বলেই সিঁড়ির দিকে ছুট দিলো সে। পিছু নিলো শিফা আর মেহরিনও।
—এই! দাঁড়া!
সুফিয়া বেগম ডাক দিলেও কেউ শুনলো না।
তিনজন সোজা গিয়ে ঢুকলো মেহরিনের ঘরে। আর ঘরে প্রবেশ করে দরজা লাগানোর সাথে সাথেই মেহরিনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো শিফা।
—তোরে আমি খুন করবো!
—আআআআ!
চিৎকার দিয়ে উঠলো মেহরিন। শিফা দুই হাতে তার চুলের মুঠি ধরে ঝাঁকাতে লাগলো।
—আমার নানি কেন? বল! আমার নানি কেন?
—মুখ ফসকে বেড়িয়ে গেছে!
—তোর মুখ ফসকে আমার নানি মরে গেলো এটাই কেনো বের হবে?
—সরি!
—সরি তোর মাথা!
—আহহহ! চুল ছাড়! টাক হয়ে যাবো আমি!
—হ! টাকই করবো!
শিফা আবারও চুল টান দিলো। মেহরিনও কম যায় না। সেও শিফার ওড়না টেনে ধরলো। দাঁতে দাঁত চেপে বললো—
—তুইও তো হ্যাঁ বলেছিস!
শিফা চোখমুখ খিঁচে নিলো। বিরক্তিকর শ্বাস ফেলে বললো—–
—স্যারের ধমকে আমার আত্মা বের হয়ে যাচ্ছিলো! আর তাই বলতে হয়েছে।
—আমারও যাচ্ছিলো!
—মিথ্যাবাদী!
—তুই মিথ্যাবাদী!
অন্যদিকে শাওন ধপ করে মেঝেতে শুয়ে পড়েছে। এক হাত কপালে।আরেক হাত বুকে।
মুখে চরম বিষাদের ছাপ তার। শাওন শুয়ে থেকে অতন্ত্য করুণ মুখ করে বললো—-
—আমি শেষ।
কেউ পাত্তা দিলো না তার কথায়। শাওন খানিকসময় চুপ ফেকে ফের বললো—-
—আমার জীবন শেষ।
এবারো কেউ পাত্তা দিলো না। শাওন কাঁদো কাঁদো মুখ করে আবারো বললো—-
—আমি মানসিকভাবে ভেঙে গেছি।
এবারও কোনো প্রতিক্রিয়া নেই মেহরিন আর শিফার মধ্যে। শাওনের নিজেকে বড্ড অসহায় মনে হলো। মেহরিন আর শিফা কি সুন্দর একে অপরকে পাত্তা দিয়ে ঝগড়া করছে। আর তাকে? তাকে কেউ পাত্তায় দিচ্ছে না? কথাখানা ভাবতেই মাথা গরম হয়ে গেলো শাওনের। শেষমেশ বিরক্ত হয়ে নিজেই উঠে বসলো সে।
—এই! আমি তোদের ব্যবহারে কষ্ট পাচ্ছি রে! একটু তো গুরুত্ব দে আমায়।
শিফা দাঁত চেপে বললো—-
—চুপ থাক!
—কেন?
—তুই হাসছিলি!
—আমি না হাসলে কাঁদতাম?
—আমাকে বলির পাঠা বানিয়েছে এই মেয়ে!
মেহরিন আঙুল তুলে বললো—-
—আমি একা না, তুইও ছিলি!
—কিন্তু নানি আমার!
—নানি তো এখনো বেঁচে আছে!
—কিন্তু স্যারের কাছে মারা গেছে!
কথাটা বলেই আবার ঝাঁপিয়ে পড়লো শিফা।
আবার শুরু হলো চুল টানাটানি। ঠিক তখনই দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলেন সুফিয়া বেগম।
আর ঢুকেই জমে গেলেন তিনি। তার সামনে যা দৃশ্য তাতে শাওন মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। শিফা মেহরিনের চুল ধরে টানছে। মেহরিন শিফার হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করছে।
বালিশ, ওড়না, চিরুনি সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পুরো ঘরে। কয়েক সেকেন্ড বোবা হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন সুফিয়া বেগম। অতঃপর চোখমুখ খিঁচে গর্জে উঠলেন—-
—এই ঘরে কি হচ্ছে?
মুহূর্তেই সব থেমে গেলো। শিফা হাত ছেড়ে দিলো মেহরিনের চুল থেকে। তা দেখে মেহরিন স্বস্তি পেলো। হাত তুলে নিজের চুল ঠিক করতে লাগলো। শাওন মেঝে থেকে উঠে বসলো খালামনিকে দেখে। মুখটা শুকিয়ে গেছে তার।
অতঃপর তিনজন একসাথে নিষ্পাপ মুখ করে তাকালো সুফিয়া বেগমের দিকে। সুফিয়া বেগম চোখমুখ কুঁচকে বললেন—-
—আমি কি তোদের মানুষ মনে করবো, না চিড়িয়াখানার পশু মনে করবো?
কেউ উত্তর করলো না তার কথার বিপরীতে। সকলে নিশ্চুপ রইলো ভয়ে। সুফিয়া বেগম বিরক্তিকর শ্বাস ফেলে পুনরায় ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে গেলেন। শিফা তা দেখে মেহরিনের দিকে একপলক তাকালো। আর মেহরিন তা দেখে বোকা বোকা হাসি ছুঁড়ে বললো—-
—এবার তোর নানি মা*রা গেছে। পরের বার আমার নানি মা*রা যাবে। হিসেব বরাবর, তাও রাগ করিস না দোস্ত।
শিফা দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে রইলো। অন্যদিকে শাওন মাথা চুলকে প্রশ্ন ছুঁড়লো—–
—তোর নানি আর আমার নানি তো একজন’ই। তাহলে তোর নানি ম*রা মানে আমার নানিও ম*রা।
—তো?
শাওনের কথার পাছে কপাল কুঁচকে প্রশ্ন ছুঁড়লো মেহরিন। শাওন ভ্রু যুগল উঁচিয়ে বললো—-
—তোদের ঝামেলার মধ্যে আমি শাস্তি পাচ্ছি, আর এখন আমার নিষ্পাপ নাদুস নুদুস নানিটাকেও টানছিস? যাহ্, দোয়া দিলাম। তোর বর টাকলা হবে।
মেহরিন চিরুনি তুলে আছড়ে ফেললো শাওনের পানে। লাফিয়ে উঠলো শাওন। মেহরিন দাঁতে দাঁত চেপে বললো—-
—কথা কম বল। গলায় হাত ঢুকিয়ে চুলকে দিবো একদম। দ্বিতীয়বার কথা বলার অবস্থা রাখবো না তোর গলার।
———————————-
শিফা, মেহরিন আর শাওনের ঝগড়াঝাঁটি থামতে থামতেই প্রায় আধা ঘণ্টা কেটে গেলো।
এরমধ্যেই সুফিয়া বেগম তিনবার এসে ধমক দিয়ে গেছেন।
—তোদের যদি নাটক শেষ হয়ে থাকে তাহলে মেহুকে তৈরি কর। মানুষজন আসার সময় হয়ে গেছে।
মেহরিন প্রতিবারই মুখ গোমড়া করে বসে থেকেছে।
—আমি নিচে নামবো না।
এই একটা কথা শুনতে শুনতেই বিরক্ত হয়ে গেছেন সুফিয়া বেগম। শেষমেষ কড়া গলায় ধমক দিয়ে বসেন তিনি। আর তার এক ধমকেই চুপসে গেলো মেহরিন। কথা আর বাড়াতে পারলো না।
শিফা আলমারি খুলে একের পর এক জামা বের করতে লাগলো। হাত চালাতে চালাতেই বললো—-
—এটা পর।
—না।
—এটা?
—না।
—এটা?
—না।
—তাহলে কি বস্তা পরে যাবি?
মেহরিন কটমট করে তাকালো। শাওন বিছানার উপর বসে নাটকীয় ভঙ্গিতে বসে বললো—-
—আমার মনে হয় কালো বোরখা পরে যাওয়া উচিত। পাত্রপক্ষ ভয় পেয়ে পালাবে।
—চুপ কর।
একসাথে বলে উঠলো মেহরিন আর শিফা।
অবশেষে আলমারির ভেতর থেকে একটি লাল টুকটু্কে শাড়ি বের করলো শিফা। শাড়িটা দেখেই থমকে গেলো মেহরিন। গাঢ় লাল রঙের শাড়ি। পাড়ে সূক্ষ্ম সোনালি কাজ। অসম্ভব সুন্দর নজরকাড়া শাড়ীটা দেখে শিফা নিজেও হা করে তাকিয়ে রইলো। ধীর হস্তে শাড়ীটা মেলে ধরে জিজ্ঞেস করলো—-
—এটাই পরবি।
শিফার কথায় চমকে উঠলো মেহরিন। ফ্যাল ফ্যাল করে খানিক্ষন তাকিয়ে থেকে উত্তর করলো—-
—না।
শিফা বিরক্ত হলো।
—কেনো?
—আমি শাড়ি পরতে পারি না।
—আমি পরিয়ে দিবো।
আর কোনো কথা বলার সুযোগ পেলো না মেহরিন। প্রায় চল্লিশ মিনিট যুদ্ধ করার পর অবশেষে লাল শাড়িতে সেজে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রইলো সে। নিজেকেই কেমন অচেনা লাগছে। চুলগুলো খোলা। কানে ছোট্ট ঝুমকা।
হালকা মেকআপে মুখটাও কেমন উজ্জ্বল দেখাচ্ছে।
শিফা দুই হাত কোমড়ে রেখে গর্বিত গলায় বললো—-
—মাশাআল্লাহ! আমার হাতের কাজ।
শাওন কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলো।
তারপর মুখ গম্ভীর করে বললো—-
—খুব খারাপ লাগছে।
মেহরিন ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
—কেন?
—এখন সত্যিই বিয়ে দিয়ে দিবে।
কথাটা শুনে মেহরিনের মুখ আবার মলিন হয়ে গেলো। ঠিক তখনই নিচতলা থেকে ভেসে এলো সুফিয়া বেগমের কণ্ঠ—-
—মেহু! তাড়াতাড়ি নিচে আয়!
তিনজনই থমকে গেলো সেই স্বরে। শাওন জানালার ফাঁক দিয়ে নিচে উঁকি দিয়ে বললো—-
—ওহ!
—কি হলো?
—মনে হয় এসে গেছে। গাড়ি পার্ক করা আছে বাগানে।
মুহূর্তেই মেহরিনের বুক ধক করে উঠলো। কাঁপা গলায় বললো—-
—কে?
—পাত্রপক্ষ।
মেহরিনের হাত’পা ঠান্ডা হয়ে এলো। সত্যিই এসেছে? এত তাড়াতাড়ি? সে ধীরে ধীরে জানালার কাছে গিয়ে নিচে তাকালো। বাড়ির সামনে দুটো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। কয়েকজন মানুষ ভেতরে প্রবেশ করছে। সুফিয়া বেগম ব্যস্ত হয়ে সবাইকে অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন। মনোয়ার শেখও হাসিমুখে তাদের ভেতরে নিয়ে যাচ্ছেন।
দৃশ্যটা দেখেই মেহরিনের গলা শুকিয়ে গেলো।
—ইয়া আল্লাহ…
শিফা তার কাঁধে হাত রাখলো।
—ভয় পাচ্ছিস?
—হুম।
—পালাবি?
মুহূর্তেই আশার আলো জ্বলে উঠলো মেহরিনের চোখে। কিন্তু ঠিক তখনই দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলেন সুফিয়া বেগম। সবার দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে বললেন—-
—কেউ পালানোর চিন্তা করবি না। বিশেষ করে তুই, মেহু।
মেহরিন থতমত খেয়ে গেলো।
—আমি তো কিছু বলিনি।
—তোর মুখ দেখেই বুঝতে পারছি তা।
শিফা মুখ চেপে হাসতে লাগলো। সুফিয়া বেগম এগিয়ে এসে মেয়ের আঁচলটা ঠিক করে দিলেন।
কয়েক মুহূর্ত মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর মৃদু স্বরে বললেন—-
—চল।
মেহরিনের বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করতে লাগলো। সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতেই মনে হলো তাকে যেন ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
————————
পাত্র পক্ষের সামনে বসিয়ে দেওয়া হলো মেহরিনকে। মেহরিন নমনীয় ভঙ্গিতে সকলকে সালাম দিলো। অতিথিগন সালামের উত্তর দিয়ে মেহরিনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে পরলেন।
—বাহ্, মেয়ে তো ভারী মিষ্টি। তা নাম কি তোমার,মা?
মেহরিন শুকনো ঢোক গিলে ধীর গলায় বললো—
—জ্বী, মেহরিন তাসনিম।
—বাহ্, বাহ্। সুন্দর নাম।
লোকটা পান চিবুতে চিবুতে বলে উঠলো। মেহরিন সেদিকে একপলক তাকিয়ে মাথা নুইয়ে নিলো।
শিফা তার পাশেই কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়ে। শাওন বিষন্ন মুখে দাঁড়িয়ে আছে৷ মনোয়ার শেখ ভালোমন্দ আলাপ করছেন অতিথিদের সাথে। এরমধ্যেই মেহরিন নিজের অস্বস্তিকে দূরে ঠেলে পাত্রকে দেখার জন্য ছটফট করতে লাগলো। পাত্র কেমন সুপুরুষ তা দেখতে হবে না? সে তো আর যাকে তাকে বিয়ে করতে পারবে না।
মেহরিন শিফার পানে একপলক তাকিয়ে সামনের দিকে তাকালো। ভালোভাবে সব পর্যবেক্ষণ করতেই কপাল কুঁচকে গেলো তার। এখানে মোট তিনজন মানুষ। একজন ভদ্রমহিলা। মনে হয় পাত্রের মা। আসার পর থেকেই মেহরিনকে ভালোভাবে দেখে যাচ্ছেন তিনি। আর বাকি দু’জন পুরুষ। একজন পুরুষের বয়স পঞ্চান্ন হবেই, সে তো তাহলে পাত্র নয়। তাহলে? পাত্র কি ভুঁড়ি ওয়ালা লোকটা?
মেহরিন চোখ বড়বড় করে নিলো। পুরুষটির দিকে তাকাতেই সে মৃদু হাসলো। মাথায় হালকা টাক লোকটার। বেশ মোটাসোটা। বয়স কম করে হলেও পয়ত্রিশ হবে। এর সাথে কি তার বিয়ে ঠিক করছে তার বাবা-মা?
মেহরিনের মাথা ঘুড়ে উঠলো কথাখানা ভাবতে গিয়ে। চোখের ইশারায় মা’কে কাছে ডাকলো সে। সুফিয়া বেগম বিরক্তিকর শ্বাস ফেলে পাশে দাঁড়িয়ে চোখের ইশারায় জানতে চাইলেন কি হয়েছে। মেহরিন ফিসফিস করে আওড়ালো—-
—মা! এই লোকটার পেট মোটা। তারমানে এ ঘুষখোর। আমি কোন ঘুষখোরকে বিয়ে করবো না, মা। তুমি আলোচনা এখানেই থামাও৷
চোখমুখ খিঁচে নিলেন সুফিয়া বেগম।
—আস্তাগফিরুল্লাহ, ইনি পাত্রের মামা।
ভরকে গেলো মেহরিন। পাশ থেকে শিফা খিলখিল করে হেঁসে উঠলো মেহরিনের কান্ডে। অন্যদিকে সুফিয়া বেগম দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে গেলেন সবকিছু।
—তাহলে পাত্র কোথায় আন্টি? আর তার নাম’ই বা কি?
শিফার কথায় সুফিয়া বেগম শান্ত গলায় বললেন—–
—পাত্র দেশে নেই। ফিরলে দেখতে পাবি। আপাতত আমরা দু’ই পরিবার কথাবার্তার মাধ্যমে সবটা গুছিয়ে রাখছি। পাত্র ফিরলে পাঁকাপাকি কথা হবে।
—দেখি দেখি আমার বউমাকে।
সুফিয়া বেগমের কথা বলার মাঝখানেই কথাটা বলতে বলতে ভদ্রমহিলা এগিয়ে এলেন। মেহরিনের পাশে বসতেই সে মৃদু হাসলো। ভদ্রমহিলা মেহরিনের মাথায় হাত বুলিয়ে হেঁসে বললেন—–
—আমার বাবাুর সাথে বেশ ভালো মানাবে কিন্তু তোমায়।
কথাটা শুনেই ফিক করে হেঁসে দিলো মেহরিন। অন্যদিকে কপাল কুঁচকে নিলেন ভদ্রমহিলা। তিনি বুঝে উঠতে পারলেন না মেহরিন হাসছে কেনো? শিফা নিজেও মুখ চেপে হাসি সংবরণ করার চেষ্টা চালাচ্ছে। সুফিয়া বেগম মেয়ের কান্ডে তীব্র বিরক্ত অনুভব করলেন। উপস্থিত সকলে মুখ চাওয়া চাওয়ি করলেও মেহরিনের হাসি থামলো না। বরং সে মুখ চেপে ভদ্রমহিলাকে বললেন——
—বাবু? বয়স কত আপনার বাবুর? কিন্ডারগার্টেনে পড়ে না-কি?
ভদ্রমহিলা বুঝলেন মেহরিন তার ডাক’কে তাচ্ছিল্য করছে। তিনি মুখ ফিরিয়ে নিলেন। সুফিয়া বেগম কপাল চাপড়াতে চাপড়াতে বললেন—–
—কোন অলক্ষুণে একে জন্ম দিয়েছিলাম কে জানে! জীবনডা তেজপাতা বানায় দিলো।
————————–
নিচ থেকে সদ্য ওপরে এসে বিছানায় বসেছিলো মেহরিন৷ বড্ড ক্লান্ত লাগছে তার। শাড়ীসহ সাজগোছ খুলে ফ্রেশ হবে বলে নিচ হতে উপরে এলো৷ এরমধ্যেই ফোনে টিং করে আওয়াজ হলো। বিরক্ত হলো মেহরিন। অসল ভঙ্গিতে ফোনখানা হাতে নিতেই জমে গেলো মেয়েটা। আদ্রিয়ানের মেসেজ জ্বলজ্বল করছে স্ক্রিনে। যেখানে সুস্পষ্ট লেখা ‘হেই সুইটহার্ট, কি করো?’
মেহরিনের মনে হলো আজকে দিনে ঘটা সকল কান্ড। ভয় হলো তার। শুকনো ঢোক গিলে ফোনের পানে তাকিয়ে রইলো। তখনি আবারো একটা মেসেজ এলো। যেখানে লেখা ‘আমার জানটা রিপ্লাই করে না কেনো?’
মেসেজটা দেখেই প্রচন্ড ক্রোধান্বিত হলো মেহরিন। আদ্রিয়ান নামক পুরুষটি যে সুযোগের সৎ ব্যবহার কারছে তা বুঝতে আর বাকি রইলো না। মেহরিনের চোখমুখ কুঁচকে গেলো। নিজের ভয়কে একপাশে ঠেলে লিখলো—-
—আপনার জানটা সিগারেট খায়, খাবেন?
ওপাশ থেকে অবাক হওয়ার ইমোজি এলো। অতঃপর লেখা—-
—এমা, ছিহ্ সুইটহার্ট ছিহ্। আমার সম্পত্তিতে তুমি সিগারেট ঠেসে ধরেছে? যেখানে আমি ঠাসিয়ে চুমু খাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছি সেখানে তুমি সিগারেট ঠেসে বসে আছো? দিস ইজ নট ফেয়ার, সুইটহার্ট। নট ফেয়ার।
ভরকে গেলো মেহরিন। আদ্রিয়ানের মতো একজন পুরুষ কি করে এমন একটা কথা বলতে পারে ভেবেই ভিষন অবাক হলো সে। সাথে রাগের ইমোজি দিয়ে লিখলো—-
—বিশ্বাস করুন, আমি ভন্ড দেখেছি। তবে আপনার মতো মারাত্মক লেভেলের ভন্ড আমি আমার জীবনেও দেখি নি।
—দেখবে কি করে। আমি তো পৃথিবীতে এক পিস’ই।
মেহরিন কাঁদো কাঁদো মুখে ফের মেসেজ পাঠালো—-
—মনে হচ্ছে আপনাকে বি*ষ খাইয়ে আমি মা*রা যাই।
তৎক্ষনাৎ উত্তর এলো না ওপাশ থেকে। মেহরিন কয়েক সেকেন্ড ফোনের পানে তাকিয়ে থেকে বিরক্ত হলো। বিছানা ছাড়তেই তৎক্ষনাৎ আবারো রিপ্লাই এলো। মেহরিন ফোন তুলে নিতেই দেখলো—-
—এতো ভালোবাসো আমাকে যে, আমাকে বি*ষ খাইয়ে নিজে মর*তে চাইছো? বাট জান, ভালোবাসি তোমায়। কি করে মর*তে দেয় আমার ভালেবাসাকে? তুমি বরং আমাকে না, নিজে বি*ষ খাও আর আমি ম*রে যাই৷ তোমার মৃ*ত্যু দেখার ক্ষমতা আমার নেই সুইটহার্ট। সত্যিই নেই।
মেহরিন তা দেখে দাঁতে দাঁত চেপে বললো—–
—বান্দির পুত একটা।
অন্যদিকে ওপাশের ব্যাক্তিটির ঠোঁটের কোণায় জ্বলে উঠলো বাঁকা হাসি। যা সম্পর্কে মেহরিনের বিন্দু মাত্র ধারণা নেই।

