Bangla Romantic Golpo | টুইঙ্কেল বেল | পর্ব ০৬
Bangla Romantic Golpo | টুইঙ্কেল বেল | পর্ব ০৬ |…
Bangla Romantic Golpo | টুইঙ্কেল বেল | পর্ব ০৬ | লেখা: লামিয়া রহমান মেঘলা
রুশোর বলা অনাকাঙ্ক্ষিত শব্দগুলো রূপকথার পৃথিবী থমকে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।
রুশো নিজের ডান হাতে রূপকথার হাতটা আলতো করে নিজের গাল থেকে সরিয়ে দেয়।
রূপকথা ফ্যাল ফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তার যেন কিছু বলার মতো অবস্থাই নেই।
রুশো, রূপকথার কাছ থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে আবারও জিজ্ঞেস করে,
“মিস, হু আর ইউ? হোয়্যার ইজ মাই মম এন্ড ড্যাড?”
রুশো একেবারে স্বাভাবিক একজন পুরুষের মতো কথা বলছে।
কণ্ঠে নেই সেই বাচ্চাসুলভ ভাব, নেই সেই আদুরে কোমলতা।
রূপকথা অজান্তেই এক পা পিছিয়ে যায়।
ঠিক তখনই রুমে ডক্টর এবং রাজিয়া শেখ প্রবেশ করেন।
ডক্টর রুশোকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। এরপর কিছু ফর্মাল টেস্ট করে রুশোর সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলেন।
“মিস্টার, আপনি গত ২ দিন, প্রায় ৪৯ ঘণ্টার মতো সময় অজ্ঞান ছিলেন। তাই আমি আপনাকে কিছু প্রশ্ন করব। আমার প্রশ্নগুলোর উত্তর দেবেন, প্লিজ।”
রুশো ভ্রু কুঁচকে তাকায়। বিরক্ত কণ্ঠে বলে,
“২ দিন অজ্ঞান থেকে রুশোর কিছু হবে না, ডক্টর। রুশো মৃত্যুকে ছুঁয়ে ফিরে আসতে জানে। এসব ফর্মালিটির প্রয়োজন আমার নেই। এই স্যালাইন খুলুন। বাড়িতে গেলেই এমনিতেই সুস্থ হয়ে যাব।”
ডক্টর রাজিয়া শেখের দিকে তাকান।
রাজিয়া শেখ এগিয়ে এসে রুশোর পাশে দাঁড়ান।
“বাবা, রুশো, এমন বলিস না। আমার জন্য প্লিজ।”
মায়ের কথায় রুশো রাজি হয়। ডক্টরের প্রশ্নের উত্তর দিতে সম্মত হয় সে।
ডক্টর শুরু করেন,
“আপনার নাম কী?”
রুশো ভীষণ বিরক্ত হয়। তবুও উত্তর দেয়,
“রুশো আজগর।”
“আপনার বয়স?”
“থার্টি টু।”
“ভেরি গুড। আপনার পেশা?”
“বিজনেসম্যান। হাউ সিলি, ডক্টর। এগুলো কেমন প্রশ্ন?”
ডক্টর নাহিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা রূপকথার দিকে তাকান।
রূপকথা তখনও স্থির চোখে রুশোর দিকে তাকিয়ে আছে। অন্তরের ব্যথা যা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব না।
ডক্টর নাহিদ মৃদু হেসে বলেন,
“মিস্টার রুশো, আজ আপনি ছাড়া পাবেন না। আপনার মাথা কেটে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। আপনি কাল বাড়ি যেতে পারবেন। আমার অনুরোধ, গায়ের জোরে কিছু করবেন না। এতে হিতে বিপরীত হবে।”
কথাটা বলে ডক্টর নাহিদ উঠে দাঁড়ান।
তিনি রাজিয়া শেখ এবং রূপকথাকে সঙ্গে আসতে বলেন।
সবাই চলে গেলে রুশো নিজের কেবিনে একা হয়ে যায়।
হাসপাতালের ধবধবে সাদা সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রুশো দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
“মেয়েটা কে? হোয়াটএভার, মমের কোনো সার্ভেন্ট হবে।”
কথাটা বলেই পরক্ষণে রুশোর মনে অদ্ভুত এক প্রশ্ন জাগে।
“কিন্তু ওর চোখ দুটো দেখে আমার এমন অদ্ভুত লাগছে কেন? ওর চোখে এত দুঃখ কেন ছিল?”
পরমুহূর্তেই সে নিজেকেই ধমক দেয়।
“রুশো, স্টপ দিস ননসেন্স। আমার এক্সিডেন্টের জন্য যারা দায়ী, আগে তাদের খুঁজে বের করতে হবে।”
রুশোর চোখে তীক্ষ্ণ আগুন জ্বলে ওঠে। চোয়াল শক্ত হয়ে আসে।
“আমি ফিরেছি। এবার কেউ রেহাই পাবে না। রুশো ইজ কামিং, অ্যান্ড আই অ্যাম ইয়োর ওয়ার্স্ট নাইটমেয়ার।”
———–
ডক্টর নাহিদের কেবিনে।
রূপকথা বসে আছে ডক্টরের মুখোমুখি। পাশেই রাজিয়া শেখ।
রূপকথা একজন নার্সিংয়ের স্টুডেন্ট। সে ভালোই বুঝতে পারছে রুশোর সঙ্গে কী ঘটেছে, কেন সে রূপকথাকে চিনতে পারছে না।
ডক্টর নাহিদ রুশোর বাকি সমস্ত রিপোর্ট দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। চোখে থাকা সাদা ফ্রেমের চশমাটা খুলে টেবিলে রাখলেন।
“রূপকথা, খুবই দুঃখের সঙ্গে আমাকে এটা বলতে হচ্ছে যে, রুশো নিজের অসুস্থতার আগের জীবনে ফিরে গিয়েছে। এক্সিডেন্টের পরের সমস্ত স্মৃতি সে ভুলে গিয়েছে।
এখন হয়তো তুমি ভাবতে পারো, আবার ওকে সব মনে করিয়ে দেওয়া যাবে। কিন্তু বিষয়টা হচ্ছে, মাত্র ৬ মাস পর আবার একটা এক্সিডেন্টের ফলে ওর ব্রেইন সার্জারি করতে হয়েছে। এমতাবস্থায় ওকে যদি প্রেসার করা হয় স্মৃতি মনে করানোর জন্য, তবে হয়তো আমরা ওকে সারা জীবনের মতো হারিয়ে ফেলতে পারি।
রুশো এখন যেমন আছে, ওকে সেভাবেই থাকতে দিতে হবে। যদি ওর সবটা মনে আসে, তবে আসবে। নাহলে রূপকথা, জীবন তো একটা লং টাইমের ব্যাপার। নতুন স্মৃতি বানিয়ে নিও।”
রূপকথার দু চোখ বেয়ে অশ্রুধারা বাধাহীনভাবে গড়িয়ে পড়ছে।
রাজিয়া শেখ রূপকথাকে জড়িয়ে ধরলেন।
“আর একটা কথা, রূপকথাকে মানাটা রুশোর জন্য হুট করে একটা ধাক্কার মতো। যদি এই মুহূর্তে রুশো রূপকথাকে নিজের স্ত্রী হিসেবে না মেনে নেয়, তবে ওকে প্লিজ এসব ধীরে ধীরে জানিও।
হুট করে এসব বিষয় নিয়ে ওকে উত্তেজিত করলে সেটাও ওর শরীরের ওপর বাজে প্রভাব ফেলবে।”
রূপকথার কান্নায় কোনো শব্দ ছিল না।
সে চুপচাপ চোখের পানি ফেলল সেদিন।
ভেতরটা এমন শূন্য শূন্য লাগছিল তার।
সবকিছু যেন এক মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেল।
তাদের সংসারটা পাখির ঘরের মতো ভেঙে চুরমার হয়ে গেল একটা ঝড়ে।
সেদিন হাসপাতালে রূপকথা থাকতে চেয়েছিল। তবে রাজিয়া শেখ তাকে বাড়িতে পাঠালেন।
মেয়েটা না খেয়ে, না গোসল করে, টানা ২টা দিন নির্ঘুম থেকে রুশোর সেবা করেছে।
এখন তার বিশ্রাম প্রয়োজন।
———-
রুশোর রুমটায় তাদের কাটানোর হাজার স্মৃতি।
দু’জনের একটা ফটো এলবামও আছে৷
সে রাতে রাজিয়া শেখ পুত্রবধূকে বিশ্রামের জন্য পাঠালেও রূপকথার চোখে ছিলোনা ঘুম।
বার বার মনে হচ্ছিলো এই রুমটায় তার আজকে শেষ রাত৷
———–
পর দিন খুব সকালে।
ঘড়ির কাটায় সকাল ৮টা বাজে।
রূপকথার চোখ দুটো শেষ রাতের দিকে লেগে এসেছিল। তাই সে বিছানার এক কোণায় রুশো এবং তার ফটো অ্যালবামটা জড়িয়ে ঘুমিয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু হঠাৎ করেই কারও চিৎকার শুনে রূপকথা হন্তদন্ত হয়ে ঘুম থেকে উঠে পড়ে। চোখের সামনের দৃশ্য দেখে সে অবাক হয়ে যায়।
রুশো রুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। রাগে ফুঁসছে লোকটা। রূপকথা তড়িঘড়ি করে বিছানা ছেড়ে নিচে নামে।
রুশো রাগান্বিত কণ্ঠে রূপকথাকে উদ্দেশ্য করে বলে,
“হাউ ডেয়ার ইউ? আমার বিছানায় কেন ঘুমিয়েছ তুমি?”
রুশোর চিৎকার শুনে রাজিয়া শেখ ভেতরে এসে উপস্থিত হন। রূপকথাকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কিছু বলবেন, তার আগেই রুশো মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে,
“মম, ইজ দিস ইয়োর নিউ সার্ভেন্ট? সার্ভেন্ট হলে তাহলে কেন এখানে, আমার রুমে, আমার বিছানায় এসে ঘুমাবে মম?”
রাজিয়া শেখ ধীর পায়ে এগিয়ে এসে রূপকথার পাশে দাঁড়ান। তাঁর চোখেমুখে স্পষ্ট ক্ষোভের ছাপ।
“মেয়েটা তোর কী, তা বোঝানোর ক্ষমতা থাকলে তোকে এখন থাপ্পড় দিতাম আমি। চল মা, তোর জন্য নতুন রুম ঠিক করেছি। আর রুশো, তুই নিজের এই চিৎকার চেঁচামেচি একটু কমিয়ে আন। কথার আঘাত বড় কঠিন, রুশো। নিজের বলা কথার জন্য তোকে পস্তাতে না হয়।”
কথাগুলো বলে রাজিয়া শেখ রূপকথাকে সঙ্গে নিয়ে রুশোর রুম থেকে বেরিয়ে যান।
রুশো নিজের চুলগুলো মুঠো করে চেপে ধরে। এই মুহূর্তে সে কিছুই সহ্য করতে পারছে না। হাসপাতালের সেই দিন রায়হানের সঙ্গে কথা বলার পর থেকেই তার মেজাজ খারাপ। তার ওপর রূপকথাকে নিজের বেডরুমে দেখে বিরক্তিটা যেন আরও কয়েকগুণ বেড়ে গিয়েছে।
রুমজুড়ে নেমে আসে এক অদ্ভুত নীরবতা। অথচ সেই নীরবতার মাঝেও রুশোর ভেতরে যেন তুমুল ঝড় বয়ে চলেছে। সে বুঝতে পারছে না কেন মেয়েটাকে দেখলেই তার ভেতরে এত অস্থিরতা জন্ম নেয়। কেন অচেনা হয়েও মেয়েটার উপস্থিতি তার মনকে এভাবে আলোড়িত করে। কিন্তু উত্তর খুঁজে পাওয়ার আগেই মাথার ভেতর তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করে সে। দুই হাত দিয়ে কপাল চেপে ধরে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। যেন নিজের ভেতরের সমস্ত অস্থিরতাকে জোর করে থামিয়ে দিতে চাইছে।
———
রাজিয়া শেখকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কান্না করছে রূপকথা। বিয়ের পর থেকে মেয়েটাকে এভাবে ভেঙে পড়তে কখনো দেখেননি তিনি।
রূপকথার কাঁপতে থাকা ঠোঁট থেকে অসহায় স্বর বেরিয়ে আসে,
“ও মা, কেন আমাকে ভুলে গেলেন উনি? কেন? ও মা, আল্লাহ আমাকে এমন শাস্তি দিচ্ছেন কেন?”
প্রতিটি শব্দের সঙ্গে যেন বুকের ভেতর জমে থাকা যন্ত্রণা গলে গলে বেরিয়ে আসছে। তার চোখের জল রাজিয়া শেখের শাড়ির আঁচল ভিজিয়ে দিচ্ছে।
রাজিয়া শেখ স্নেহভরা হাতে রূপকথার মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। অথচ তাঁর নিজের বুকটাও যেন হাহাকারে ভরে উঠছে। মেয়েটার এই কান্নার সামনে সব ভাষা, সব সান্ত্বনা বড় অসহায়।
ভারী কণ্ঠে তিনি বললেন,
“মারে, তোকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা যে আমার নেই। আমাকে ক্ষমা করে দে মা। মনে হচ্ছে তোর জীবনটাই নষ্ট করে দিলাম আমি নিজের হাতে। “
রূপকথা চোখ মুছতে মুছতে মৃদু হেসে আবার কেঁদে ওঠে।
“লোকটা আমার আঁচল মুঠোবন্দি করে রাখলে মাঝে মাঝে বড্ড বিরক্ত লাগত, আম্মু। মনে হতো একটু স্বাধীনতা পাই। কিন্তু আজ কেন জানি মনে হচ্ছে, সে যেন সারাটা জীবন আমাকে নিজের কাছে বন্দি করে রাখুক। আমি কবে এতটা পর হয়ে গেলাম নিজের কাছ থেকে, আম্মু? কবে এতটা রুশোর হয়ে গেলাম?”
শেষ কথাটুকু বলতে গিয়ে তার গলা আটকে আসে।
ভালোবাসা মানুষকে কখন নিজের মধ্যে গুটিয়ে নেয়, কখন একজন মানুষ আরেকজনের অস্তিত্বে মিশে যায়, তা হয়তো কেউ বুঝতে পারে না। রূপকথাও পারেনি। বুঝতে পেরেছে কেবল আজ, যখন তার সবচেয়ে আপন মানুষটাই তাকে চিনতে পারছে না।
রাজিয়া শেখ চোখের কোণের জল আড়াল করে বললেন,
“চিন্তা করিস না মা। আমি চেষ্টা করব ওকে সব মনে করাতে।”
কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই মাথা নাড়িয়ে দেয় রূপকথা।
“না মা, করো না। প্লিজ করো না। আর যাই হোক, আমার সামনে সুস্থ আছেন উনি। এতেই হবে আমার। আমি ওনাকে প্রচণ্ড ভালোবাসি, আম্মু। ওনাকে কষ্টে দেখতে পারব না। যদি সত্যিই ওনার মস্তিষ্কে আবার কোনো আঘাত লাগে, যদি কোনো ক্ষতি হয়ে যায়, তবে কী হবে? এমন কিছু করবেন না, মা। আমি সেটা সহ্য করতে পারব না।”
কথাগুলো বলতে বলতে আবার কান্নায় ভেঙে পড়ে সে।
নিজের ভালোবাসাকে ফিরে পাওয়ার সুযোগ সামনে থাকা সত্ত্বেও, সেই মানুষটার সামান্য কষ্টের আশঙ্কায় নিজের সমস্ত চাওয়া, সমস্ত অধিকার, সমস্ত স্বপ্ন বিসর্জন দিতে প্রস্তুত হয়ে আছে মেয়েটা।
রাজিয়া শেখ বারবার অবাক হন রূপকথার কথা শুনে। এই যুগে এমন নিঃস্বার্থ ভালোবাসা সত্যিই কি সম্ভব?
একটা মেয়ে, যে নিজের সুখের কথা একবারও ভাবল না। যে স্বামীর স্মৃতি ফিরে পাওয়ার জন্য আকুল, অথচ সেই স্মৃতি ফেরাতে গিয়ে তার ক্ষতির আশঙ্কাতেও পিছিয়ে যাচ্ছে।
রাজিয়া শেখের চোখ ভিজে ওঠে।
ভালোবাসা হয়তো এমনই।
যেখানে পাওয়ার চেয়ে হারানোর ভয় বেশি থাকে।
যেখানে নিজের অধিকার দাবি করার আগে প্রিয় মানুষটার সুস্থতা আর হাসিকে বেছে নেওয়া হয়।
যেখানে একজন মানুষের পুরো পৃথিবী হয়ে ওঠে আরেকজন মানুষ।
আর সেই ভালোবাসার নামই হয়তো রূপকথা।
চলবে?

