Bangla Romantic Golpo | সুইটহার্ট | পার্ট-৩
মনের মধ্যে একরাশ আশংকা নিয়ে বাড়িতে পা রাখলো মেহরিন। পিছুপিছু…
মনের মধ্যে একরাশ আশংকা নিয়ে বাড়িতে পা রাখলো মেহরিন। পিছুপিছু স্বগতিতে হেঁটে এলো শাওন। মেহরিনের মা সুফিয়া বেগম মেয়ের পিছুপিছু শাওনকে দেখে বেশ অবাক হলেন। শাওন যে আসবে তা তিনি জানতেন না মোটেও। তড়িঘড়ি করে রান্নাঘর হতে বেড়িয়ে এলেন তিনি। আঁচলে হাত মুছে সুধালেন—-
—আরে আব্বা! তুই? মেহুর সাথে?
খালামনিকে দেখে একগাল হাসলো শাওন। ধপ করে সোফায় বসে গা এলিয়ে দিয়ে বললো—
—হ্যাঁ খালামনি। চলে এলাম। এখন থেকে
এখানেই থাকার প্ল্যান করেছি আমি।
—মা, বাবা কোথায়?
শাওনের কথার মাঝেই ঢুকে গেলো মেহরিন।
সুফিয়া বেগম বিরক্ত হলেও কিছু বললেন না। শাওনের হাতে পানির গ্লাস তুলে দিতে দিতে বললেন—-
—দেখ কই গেলো। কে জানি ফোন দিলো, সেটা নিয়েই ঘরে চলে গেলো।
মেহরিনের বুকটা ধক করে উঠলো।
ফোন? আদ্রিয়ান কি তবে সত্যিই ফোন করেছে?
কথাখানা ভাবতে গিয়ে মুহূর্তেই গলা শুকিয়ে এলো মেহরিনের। কাঁপা কাঁপা চোখে বাবার ঘরের দিকে একবার তাকালো সে। দরজাটা বন্ধ। ভেতর থেকে কোনো আওয়াজও আসছে না।
—আমি রুমে যাচ্ছি।
কথাটা বলেই আর দাঁড়ালো না মেহরিন। প্রায় দৌড়ে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিলো।
বিছানার উপর বসে কয়েক মুহূর্ত হাঁপাতে লাগলো সে। মাথার মধ্যে একই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। যদি বাবা সব জেনে যায়? যদি আদ্রিয়ান স্যার সব বলে দেয়? যদি আজকেই আমার জানাজা হয়ে যায়?
বিরক্ত হলো মেহরিন। শেষের কথাগুলো ভাবতেই নিজের মাথায় আলতো করে চাপড় মারলো সে। বিড়বিড় করে আওড়ালো—–
—হায় আল্লাহ! কেন যে ওই মেসেজটা পাঠাতে গেলাম!
অনেকক্ষণ অস্থির হয়ে বসে থাকার পর ফ্রেশ হওয়ার জন্য ওয়াশরুমে ঢুকে গেলো মেহরিন। ঠান্ডা পানি মুখে দিতেই কিছুটা স্বস্তি পেলো। তবে বুকের ধুকপুকানি একটুও কমলো না। প্রায় বিশ মিনিট পর ফ্রেশ হয়ে বের হলো সে। ভেজা চুল তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতে বিছানার দিকে এগোতেই হঠাৎ ফোনে মেসেজের শব্দ ভেসে এলো।
কপাল কুঁচকে গেলো মেহরিনের। আদ্রিয়ানের কথা মনে পরতেই তার বুকের ভেতরটা আবারো ধড়াস করে উঠলো। ধীরে ধীরে ফোনটার দিকে তাকালো সে। স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে একটি নোটিফিকেশন। নাম দেখে মুহূর্তেই গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলো তার।
—ইয়া আল্লাহ…
কাঁপা হাতে ফোনটা তুলে নিলো মেহরিন।
তার আঙুল পর্যন্ত কাঁপছে তীব্র ভয়ে। অনেক সাহস সঞ্চয় করে মেসেজটা খুলতেই তার চোখ দুটো বিস্ফারিত হয়ে গেলো।
—হেই সুইটহার্ট।
মেসেজটা দেখে মেহরিনের চোখ কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো। হাতের ফোনটা প্রায় ফেলে দিচ্ছিলো সে। কয়েক মুহূর্ত হাঁ করে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলো। অতঃপর কাঁপা কাঁপা আঙুলে টাইপ করলো—-
—আপনি… আপনি কি আমায় চেনেন?
মেসেজটা সেন্ড হতেই বুকের ধুকপুকানি আরও বেড়ে গেলো মেহরিনের। ঘামতে লাগলো মেয়েটা। কয়েক সেকেন্ড পরই রিপ্লাই এলো।
—তুমি তো আমায় চিনো। তাই না?
মেহরিন থমকে গেলো সেই কথায়। ভ্রু কুঁচকে গেলো তার। কথাটার মানে কি? সে শুকনো ঢোক গিলে আবার লিখলো—-
—আমি কিছু বুঝতে পারছি না।
মেহরিন মেসেজ পাঠালেও কয়েক সেকেন্ড কোনো রিপ্লাই এলো না ওপাশ থেকে। মেহরিন অপেক্ষা করছিলো রিপ্লাইয়ের। কিন্তু অনেকটা সময় পেরিয়ে গেলেও উত্তর এলো না। সে ভাবলো উত্তর আসবে না। তাই ফোন বিছানায় ছুঁড়ে ফেলতে হাত তুলতেই টুং করে আবারো শব্দ হলো। মেহরিন ভরকে গিয়ে মেসেজটা ওপেন করলো—
—বুঝতে পারছো না? না-কি বুঝতে চাইছো না? শুরুটা তুমিই করছো সুইটহার্ট, শেষটা আমি’ই করবো।
মেসেকটা দেখে মেহরিন ধপ করে বিছানায় বসে পরলো৷ সে বেশ বুঝে গেছে, আদ্রিয়ান তাকে আর ছাড়বে না। নিশ্চয়ই চিনেও ফেলেছে তাকে। মেহরিনের বড্ড কাঁদতে ইচ্ছে হলো। সেদিনের প্রতিশোধ নিতে গিয়ে নিজেই যে নিজের পায়ে কুড়াল মেরে বসেছে তা বুঝতে আর বাকি রইলো না।
—বেইবি, কি করছিস?
ভাবনার মাঝেই দরজার ওপাশ থেকে ভেসে এলো এহেন স্বর। কপাল কুঁচকে নিলো মেহরিন। বুঝতে পারলো, দরজার ওপাশ থেকে নক করে যাচ্ছে শাওন। শাওনের মুখে বেইবি ডাক’টা শুনে আচমকা বড্ড রাগ হলো তার। মনে পরলো আদ্রিয়ানের কেবিনে উপস্থিত থাকা সেই রমনীটির কথা। আর মনে হতেই ভিষন রাগ হলো তার। কি ন্যকামোই না করে আদ্রিয়ানকে সে বেইবি বলে ডাকলো? আর আদ্রিয়ানও কিচ্ছু বললো না। উফ্!
—কি করছিস বেইবি? আর ইউ ওকে না? দরজা খুলছিস না কেনো?
পুনরায় সে শব্দে মেহরিন দাঁতে দাঁত চেপে দরজার পানে এগিয়ে গেলো৷ সপাটে দরজা খুলে আচমকা শাওনের ঝাঁকড়া চুলের মুঠি চেপে ধরলো সে। তীব্র ব্যাথায় কুঁকিয়ে উঠলো শাওন—
— আহ্৷ আহ্ কি করছিস? মেহু ছাড়।
—ছাড়বো না? হা*রামজাদা, বেইবি কাকে বলছিস তুই? কোন অ্যাঙ্গেলে আমাকে বেইবি মনে হয়? বাচ্চা আমি? বাচ্চা ভাবছিস আমায়?
মেহরিন আচমকা শাওনকে ছেড়ে সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখাতে দেখাতে বললো—-
—দেখ রে গরু, বাচ্চা নয় আমি। উল্টো আর একটা বাচ্চা পয়দা করার ক্ষমতা রাখি আমি৷দেখ ভালো করে দেখ।
কথাটা শেষ করেই বিজয়ীর ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইলো মেহরিন।অন্যদিকে শাওন কয়েক সেকেন্ড হা করে তাকিয়ে রইলো তার দিকে।
—কিহ্…..
অতঃপর নিজের দুই কান চেপে ধরলো সে। চিৎকার দিয়ে ডেকে উঠলো খালামনিকে।
—খালামনি! খালামনি! তোমার মেয়ে দিন দিন তারকাটা হয়ে যাচ্ছে! মাথার সব তার ছিঁড়ে গেছে। দেখো কি অদ্ভুত কথা বলছে।
—চুপ কর!
বলে আবারও শাওনের মাথায় একটা গাট্টা বসিয়ে দিলো মেহরিন। শাওন ব্যাথায় চোখমুখ খিঁচে নিলো।
—আউচ্!
ব্যাথাতুর আওয়াজ করেই ফের বললো—-
—আমি তোকে দেখতে এসেছি, আর তুই আমাকে এভাবে মা*রছিস? মে*রে দিবি না-কি?
—আর একবার বেইবি বললে সত্যিই মে*রে ফেলবো তোকে।
শাওন তড়িঘড়ি করে দুই হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গি করলো। অতঃপর স্বশব্দে আওড়ালো—-
—ওকে ওকে! আর বলবো না। এই জীবনেও আর বেইবি বলবো না।
—গুড।
সন্তুষ্ট হয়ে মাথা নাড়লো মেহরিন। শাওন বিরক্তিকর শ্বাস ফেলে বেড়িয়ে গেলো মেহরিনের ঘর ছেড়ে৷ বেচারা যত’ই মেহরিনকে একটু নিজের দিকে টানতে চায় ততবারই ফেল করে বসে।
————————-
অন্যদিকে ঠিক সেই সময় শহরের অভিজাত এলাকায় অবস্থিত চৌধুরী ম্যানশনের বিশাল ড্রয়িংরুমে বসে ছিলেন আশিক চৌধুরী ও তার স্ত্রী সাহেলা চৌধুরী। আশিক চৌধুরী সংবাদপত্রে চোখ বুলাচ্ছিলেন। আর সাহেলা চৌধুরী বিরস মুখে সোফায় বসে ফল কাটছিলেন। বাড়িটা বড্ড ফাঁকা তাদের। একমাত্র ছেলে আদ্রিয়ান চৌধুরী ছাড়া আর কোন দ্বিতীয় সন্তান নেই। ছেলেটাকে বিয়ে দিতে চাইলেও সেদিকে তার কোন ধ্যান নেই। আর সেই বিষয়ে কথা বলতে বলতে থেমে গেছেন তারা।
একটু আগেই স্বামী-স্ত্রী ঝগড়া করেছেন ছেলের বিয়ে নিয়ে। সাহেলা চৌধুরী স্বামীকে বলেছিলেন যেভাবে পারো ছেলেকে বিয়ে দেওয়ার ব্যাবস্থা করো। তবে আশিক চৌধুরী ব্যর্থ হন স্ত্রী’র কথা রাখতে। আর তা’ই জন্য’ই দুজন কপোত-কপোতী প্রথমে ঝগড়া করে এখন বিরস মুখে বসে আছেন। কথা বলছেন না একে অপরের সাথে।
ঠিক তখনই নিরবতার বুক চিরে সামনের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলো আদ্রিয়ান। গটগট করে হেঁটে এসে কোটটা সোফায় রাখলো সে।
ছেলেকে দেখে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো সাহেলা চৌধুরীর মুখ। ভাবলো ছেলেকে বিয়ের কথা আবারো একবার বলবে। জানে, বললে নিশ্চয়ই আবারো বকা খেতে হবে, তবুও বলবেন বলে ঠিক করলেন তিনি। হাসি হাসি মুখ করে ডেকে উঠলেন ছেলেকে—-
—এই তো আমার ছেলে! বাবা একটা কথা বলবো তোকে?
—হুম।
সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলো আদ্রিয়ান। আশিক চৌধুরী বুঝলেন স্ত্রী কি বলতে পারে, তাই আগেভাগেই চোখের ইশারায় বারণ করলেন বিয়ের কথা না বলতে। ছেলে সবে ফিরেছে, এখব রেগে গেলে কি হবে? স্বামীর চোখের ইশারায় চুপসে গেলেন সাহেলা চৌধুরী। প্রসঙ্গ পাল্টে মলিন মুখে জিজ্ঞেস করলেন—-
—খেয়েছো কিছু?
—না।
—দেখেছো ছেলের কান্ড। না খেলে শরীর খারাপ করবে তো বাবা।
স্নেহ মিশ্রিত কন্ঠে বললেন সাহেলা চৌধুরী।
আদ্রিয়ান সোফায় বসে ফোন বের করলো।
কয়েক সেকেন্ড স্ক্রিনে কিছু টাইপ করতেই আশিক চৌধুরীর ফোনে টুং করে শব্দ হলো।
কপাল কুঁচকে ফোন বের করলেন তিনি। একটি নাম্বার পাঠিয়েছে আদ্রিয়ান। আশিক চৌধুরী অবাক হয়ে বললেন—-
—এটা কার নাম্বার?
আদ্রিয়ান বাবার পানে তাকালো। নির্বিকার গলায় উত্তর দিলো—-
—তোমাদের বউমাকে ঘরে আনার ব্যবস্থা করো। এটা শ্বশুর মশাইয়ের নাম্বার।
কথাটা শুনে আশিক চৌধুরীর হাত থেকে প্রায় ফোন পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। চোখজোড়া বড় বড় হয়ে গেলো তার। যেই ছেলেকে জোড় করেও বিয়ে করাতে পারছেন না সেই ছেলে আজ তাকে এরূপ কথা বললো?
—কি!!
সাহেলা চৌধুরীও হাতের ছুরিটা নামিয়ে বিস্ফারিত চোখে তাকালেন। ভুল শুনলেন কি-না যাচাই করার জন্য চোখ ঘষলেন।
—আদ্রিয়ান, তুই কি বললি?
বাবার কথায় আদ্রিয়ান শান্ত ভঙ্গিতে সোফায় হেলান দিলো।
—যেটা শুনেছো।
—তোর… তোর পছন্দের মেয়ে আছে? তাই বিয়ে করছিস না?
আশিক চৌধুরীর গলায় স্পষ্ট অবিশ্বাস। আদ্রিয়ানের ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি ফুটে উঠলো। বিড়বিড় করে বললো—-
—মনে হয় আছে।
ব্যাপারটা বুঝে উঠতে না পেরে হতভম্ব হয়ে একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন আশিক চৌধুরী আর সাহেলা চৌধুরী। আদ্রিয়ান সেসবে পাত্তা না দিয়ে কোট তুলে উপরের দিকে পা বাড়ালো। নিচে রেখে গেলো হতভম্ব হয়ে যাওয়া বাবা-মা’কে।
চলবে……

